কাবিদুল দা (পর্ব ৫)

(চতুর্থ পর্বের পর….)

জামাকাপড় পালটে, ফ্রেশ হয়ে, ডিনার করতে বসলাম যখন তখন বাজে রাত ১১ঃ৪০। মা এখনও খায়নি, আমার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে। বাবা শুয়ে পড়েছে। ভাবলাম সোনার চেন চুরির ব্যাপারটা খাওয়া সেরে বলবো, এখন বললে আমার সঙ্গে মায়েরও খাওয়া লাটে উঠবে।

ডিনার করতে করতেই মায়ের চোখে পড়ল আমার গলায় চেনটা নেই। 

-“গলার চেনটা কোথায় খুলে রাখলি আবার!? তোর আবার ভুলো মন। বারবার বলেছি চেনটা খুলে সবসময় আমার কাছে রাখবি, নাহলে আবার খুঁজে খুঁজে হন্যে হবি তো!! কোথায় রেখেছিস, মনে আছে? নাকি এর মধ্যেই ভুলে গেছিস আবার!?” বলে মা একদলা ভাত মুখে পুরল।

-“চেনটা…..চুরি হয়ে গেছে মা! গাড়িতে আমি বসেছিলাম, তারপর একটা ভিখারি….” মা’কে সবটা বললাম।

সবটা শুনে মা চুপ। প্রায় ৫ মিনিট দুজনেই চুপ, শুধু দেওয়াল ঘড়ির টিক টিক শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমি বললাম, “কি গো কিছু বল!? আমার তো এবার তোমাকে নিয়ে টেনশন হচ্ছে!” 

-“কাবিদুলের হাত থাকতে পারে!”

-“হোয়াট!!!! ফাই, না না! ওর হাত থাকলে ও ওভাবে কেন দৌড়ত চোরের পেছনে!? আর, আর আমাকে হলমার্ক নাম্বার লিখে ডায়েরি করতেই বা কেন বলতো? ও এমনকি….” থমকে গেলাম। না, টাকা নিতে চায়নি ব্যাপারটা বলা যাবে না। তাহলে ৮০০ টাকা জোর করে দিয়ে যে টাকাটা আমার কাছে আছে, ৪০০ টাকা সেটা মা নিয়ে নেবে। তাই চেপে গেলাম।

-“ওসব তাছাড়া টাছাড়া নয়। শোন আমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। মোসলমানদের এইজন্য বিশ্বাস করতে নেই। তুই তো এত্তদিন যাচ্ছিস, কলেজে, এদিকে ওদিকে। কই এতদিন কিস্যু হোল না, আজকেই এমন হতে হোল। বাঙ্গালকে হাইকোর্ট দেখানো!! ওসব নাটক ওর।”

মায়ের কথাটা একেবারে হাওয়ায় উড়িয়ে দেওয়ার কথা কি!? নিজেকে প্রশ্ন করলাম।! ও যদি সত্যি হারটা নিয়ে থাকে তাহলে প্রায় ৫০ হাজার টাকা তো পাবেই। তাই গাড়ি ভাড়ার ১২০০ না নিলেও পুষিয়ে যাবে, এদিকে ভালোমানুষির ইমেজটাও ধরে রাখা যাবে। কিন্তু আপাতত এই চিন্তা সরিয়ে মা’কে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি কথাটা কালকেই বাবা কে বলবে!? মানে… আমাকে বাবা কেটে ফেলবে তো!!”

-“আমি কেটে ফেলিনি যখন বাবা’ও কেটে ফেলবে না। তুমি অসহায় মানুষকে সাহায্য করতে গেছ, গাড়ির মধ্যে বসে। দোষটা তোমার না। আনফরচুনেট ঘটনা একটা।” মা বলল, তারপর মা বিড়বিড় করে বলল, “তোকে ওরম চেন পরিয়ে আজকালকার দিনে এভাবে বাইরে যেতে দেওয়ার সিদ্ধান্তটাই আসলে ভুল ছিল। কারোরই এখন সোনা পরে বাইরে যাওয়ার জো নেই। সব আলমারি তে তুলে রাখলে তবে বাঁচোয়া!!”

বেশ বুঝলাম কেসটা সেটল হয়ে গেছে। আর চাপ নেই। বেশি চাপ মা’কে নিয়েই হয়। মা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে যখন, বাবা বুঝে যাবে। কিন্তু মা যে কথাগুলো কাবিদুল দা’র সম্মন্ধে বলল, সেগুলো!!?

বেশি ভাবতে পারছিনা আর। মা গুডনাইট বলে শুতে চলে গেল। আমিও আমার রুমে ঢুকে ভেতর থেকে লক দিয়ে বিছানায় এসে বসলাম। চোখ গিয়ে পড়ল আমার পড়ার টেবিলের ওপর। কাবিদুল দা’র কার্ড। কার্ডটা কেন দিল ছেলেটা।? ওর অনেক আচরণই আজ আমাকে অনেকভাবে সংশয়ে ফেলেছে।

নাইট ল্যাম্প জ্বেলে, কার্ডটা হাতে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। মোবাইল নাম্বারটা সেভ করে হয়াটসাপ খুলে কন্ট্যাক্ট এ গিয়ে স্ক্রোল করতেই চলে এল, কাবিদুল। হ্যাঁ এটাই। প্রোফাইল পিকচারটা দেখতে পেলাম। ছবিটা জিমে তোলা। খালি গা। একহাতে একটা ডাম্বেল চাগিয়ে আছে। চোখ ডাম্বেল তোলা  হাতের বাইসেপের দিকে।

আসুরিক পেশীবহুল চেহারা। সিক্স প্যাক, লোভনীয়, সুস্বাদু একটা শরীর। আমি আমার ঠোঁট কামড়ে ধরলাম। মাথায় পরপর আজকে ওর সাথে কাটান মুহূর্ত, কথা, চোখে চোখে দেখা এইসব মনে পড়তে লাগলো। কার্ডটা কেন দিল ও আমায়।? কি চায় ও! মা চেন চুরি নিয়ে যে কথাগুলো…

প্রোফাইল ফটোটা সেভ করে ব্যাক করতেই দেখি, তিনি অনলাইন। করবো মেসেজ!? কেন করবো!? ও আমাকে কার্ডটা এইজন্য দিয়েছে!? মনে মনে না না চলছে আবার ছেলেটা খেয়েছে কিনা জানতে ইচ্ছে করছে খুব। ফোনটা পাশে রেখে দিলাম অস্থির হয়ে। মিনিট পরে আবার ফোনটা হাতে নিয়ে একটা গভীর শ্বাস নিয়ে, ওকে টাইপ করলাম, “খাওয়া হয়ে গেছে!?”

এভাবে হঠাত বলবো!? আমি শুভ, অন্তত এটুকু বলি আগে। ওয়েট! এই আমার প্রোফাইল পিকচার কি আছে এখন!!??? নিজের প্রোফাইল পিকচার চেক করলাম। ওর গাড়িতে বসে আজই নেওয়া একটা সেলফি, সেটা! ও হ্যাঁ তাই তো! এটা ওই পেট্রোল পাম্পের ওখানে তোলা। ফিরে এলাম টাইপিং এ, আর কিছু না ভেবে পাঠিয়ে দিলাম মেসেজ।

কাবিদুল দা অনলাইন। ১০ সেকেন্ড, ২০ সেকেন্ড। ও আমার মেসেজ দেখছে না কেন!? আমি মেসেজ করেছি! আ মি। আ মি  শু ভ। সঙ্গে সঙ্গে দেখা উচিত। কোন এমন জরুরি মানুষের সাথে কথা বলছে…??

মেসেজ এর ছাই রঙ হোল নিল। আমি উত্তেজনায় ফোনটা ফেলে দিলাম পাশে। হার্ট রেট বেড়ে গেছে। কিছু মুহূর্ত পর, “টিং”

-“হ্যাঁ খেয়েছি। তুমি?”

মেসেজটা পড়ে আমি যেন আনন্দে দিশেহারা হয়ে গেলাম। এমন কিছুই না, কোন যুক্তিই নেই, তবুও এত আনন্দ হোল যে ডানহাতটা মুঠো করে কামড়ে ধরলাম।

-“হ্যাঁ! এই হোল।”

-“চেনের ব্যাপারটা!?”

-“মা কে বললাম। বাবা শুয়ে পড়েছে, মা কাল সকালে বাবাকে বলে দেবে। এমন কিছু ইস্যু করেনি। আমি একটা দুঃস্থ মানুষকে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম, আমার মানসিকতার জন্য …. ইত্যাদি ইত্যাদি….”

-“কেন কাবিদুল চুরি করেছে, উনি বলেননি!?”

-“কেন!? একথা বলবে কেন!? তুমিই যে আমাকে থানায় কিভাবে কি করতে হবে বলেছ, এসবও তো আমি বলেছি। তারপর সন্দেহের জায়গা হয় কিকরে!?” মিথ্যেটা বলতে হোল আমায়।

-“হ্যাঁ, জানি। বুঝি। কে কিভাবে কি বোঝে চোখ দেখে বুঝতে পারি।”

ঢোঁক গিলে, টপিকটা পালটে বললাম, “ডিপিটা সুন্দর! আমি জিম জয়েন করেছিলাম কিছু বছর আগে। একদিন গিয়েই যা ক্লান্ত হয়ে গেছিলাম যে আর যাইনি। উফ! ট্রেডমিলে কি ছোটান ছুটিয়েছে ট্রেনার। পায়ে ব্যাথা ছিল ৩ দিন।”

-“ভুল শিখিয়েছে। ব্যাথা হয়, অতটাও হয়না। আমার সঙ্গে জিমে এসো একদিন। তারপর জিম অত দুঃখের জায়গা মনে হবে না।”

-“বেশ। যাব একদিন।” নিজের ঠোঁট কামড়ে, লজ্জা পেয়ে বললাম।

-“গাড়িতে বসে সেলফি তুললে কখন? ওই আমি যখন নেমে গেছিলাম, পাম্পের ওখানে!?”

-“হ্যাঁ! তুমি যা সিরিয়াস! তুমি থাকাকালীন আর সেলফি কি তুলবো! তারপর তুমি কেক নিয়ে ফিরলে আমার জন্য কেক আনলে না, শুধু দিদির জন্য আনলে!”

-“ওবাবা! এই, তোমার খিদে পেয়েছিল নাকি!? যাহ্‌! ভুল হয়ে গেছে খুব। ইস! তুমি ওইজন্য আমি যখন খেতে বলছিলাম, খাবোনা খাবোনা করছিলে!?

-“হম”

-“দেখলে শেষমেশ খেতেও হোল, কেক; সঙ্গে আমার কামড় ও (হাসির ইমোজি)। হাতে ব্যাথা নেই তো আর!?”

-“না, আরনিকা খেয়ে সেরে গেছে।”

ও মেসেজটা পড়েছে। কিছু লিখছে না আর। আমিও কি লিখব বুঝতে পারলাম না। ওর আবার টাইপিং দেখাচ্ছে…

-“কাল সকালেই থানায় ডায়েরিটা করো কিন্তু!”

-“হ্যাঁ যাব। এই জানো আমি আগে কখনও থানায় যাইনি, তুমি গেছো!?”

-“হাহাহা, হ্যাঁ গেছি তো। কিছু অনুষ্ঠানের পারমিশন, ফোন চুরি এইসবের জন্য যেতে হয়েছে তো।”

-“ও আচ্ছা!”

-“তুমি আগে কখনও থানায় যাওনি? তো কাল আমি যাবো তোমার সাথে? থানার বড়বাবু আমার পরিচিত। তোমার বিষয়টা আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন তাহলে।”

-” হ্যাঁ! চল তাহলে! ভালই তো হোল! এই শোন না, আমি কখনও নিজের চোখে জেলের গরাদের পেছনে কয়েদি দেখিনি। আমায় দেখাবে!? ” আমি উতফুল্ল হয়ে বললাম।

কাবিদুল দা, হোহো করে হাসার ইমোজি পাঠিয়ে বলল, “আচ্ছা আচ্ছা দেখাবো! উফফ!! কয়েদি দেখবে বাচ্চা ছেলে!! ঠিক আছে কাল ওই সকাল ১১ টা। অসুবিধে নেই তো!?”

-“হ্যাঁ ঠিক আছে। নো চাপ! আর বাচ্চা কাকে বলছ!? আমি মোটেই বাচ্চা নই! হুহ!”

-“হ্যাঁ, সবাই জানে তুমি কি!! দমফাটা হাসির ইমোজি!”

-“এই যাও তো। খালি বোকার মতো হেসে যাচ্ছে। কাল সকাল ১১টা তাহলে। তুমি কি তোমার দামড়া গাড়ি নিয়ে আসবে!?”

-“গরীবের আবার নিজের গাড়ি!? চারচাকার মালিক অন্যকেউ, আমি শুধু চালাই এই যা। তবে নাচিজ এর কাছে একখানা বাইক আছে। বাইকে অসুবিধে নেই তো!!”

-“না না, বাইকে আবার কি অসুবিধে।! ঠিক আছে। এসো!

-“আচ্ছা। আর রাত করো না, শুয়ে পড়। কাল যাচ্ছি। আমারও ঘুম পাচ্ছে।

-“হম হম গুডনাইট”

-“গুডনাইট” পাশে লাল হার্ট।

লাল হার্ট পাঠিয়েছে। লাল হার্ট। মাথামোটা ছেলেটা লাল হার্ট পাঠিয়েছে। 

আমি ফোনটা পাশে রেখে, সিলিং এর দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসতে হাসতে লজ্জায় পাশবালিশ জড়িয়ে পাশ ফিরে চোখ মুজলাম।

(ক্রমশ….)   

(অনুগ্রহ করে ব্লগের নিচের কমেন্ট বক্সে জানান, কেমন লাগছে পড়ে। এতে উৎসাহ পাওয়া যায়।)

Author:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *