কাবিদুল দা (পর্ব ৩)

(দ্বিতীয় পর্বের পর….)

-“এসো, এসো পারমিতা (আমার দিদির ভালো নাম)। কিরে মামন কেমন আছিস!!? বড়মা কে ভুলেই গেলি নাকি রে!!?” দরজা খুলেই একগাল হেসে বলল, আমার দিদির যা, সুমনা দি। সুমনা দি কে আমি বড়দি বলে ডাকি। ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে আমরা সব ঢুকলাম। কাবিদুল দা, হেসে বলল, “আসি তাহলে!?”

আমার দিদি কার্ত্তিক দা’কেও কোনদিন ঘরে আসতে বলে না। কিন্তু আজ দেখি কাবিদুল দা’কে বলল, “না না, একি, এতটা এলে। অন্তত এক কাপ চা খেয়ে যাও। দি (যা কে আমার দিদি,  দি বলে ডাকে) খুব ভালো চা করে। একটু চা খেয়ে যাও অন্তত।

কাবিদুল দা না না করে উঠল। দিদির শাশুড়ি মা’ও বললেন, “বাবা এসো না, এতটা এলে। এক কাপ চা খেয়ে যাও বাবা। বেশি রাত্তির তো হয়নি। যাবে এখন।” কাবিদুল দা তখনও কিন্তু কিন্তু করছে দেখে আমি বললাম, “এত করে বলছেন, বয়স্কা মানুষ। খুব অসুবিধে না থাকলে চা’টা খেয়ে যেয়ো।”

কাবিদুল দা আর কিছু বলল না, একটা অগত্যা আচ্ছা মার্কা হাসি দিয়ে সম্মতি জানাল। বড়দি চা করতে চলে গেল হাসি মুখে। আমি বললাম, “জুতোটা খোল এবার! বাইরে থেকেই চা খাবে নাকি!”

দিদির শাশুড়ি মা কথাটা শুনে, “হ্যাঁ বাবা, একি এখনও জুতো পড়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছো। এসো এসো! লজ্জা করো না!” লজ্জা করোনা কথাটা শুনে আমি একটু ফিক করে হেসে ফেললাম। কাবিদুল দা সেটা দেখে আরও লজ্জায় মাথা নিচু করে চুপচাপ জুতো খুলে, ঘরে ঢুকল। 

দিদির বাড়ির সামনেই গঙ্গা। মানে হেঁটে বড়জোর ২০০ মিটার, এমন দূরত্ব। ছাদ থেকে সুন্দর দেখা যায় নদির এপার ওপার। জাহাজ যখন যায় ভোরবেলা, তখন তার সাইরেনের দীর্ঘ আর জোরালো আওয়াজে রোজ ঘুম ভেঙ্গে যায় বলে আমি সাধারণত দিদির বাড়ি রাত্রিযাপন করতে চাই না। কিন্তু এখানে এলে আমি একবার ছাদে যাবোই, সেটা যদি ৫ মিনিটের জন্যও হয়। 

আমাকে ফিরতে হবে কাবিদুল দার সাথে। সময় একেবারেই নেই। তবু নিয়ম রক্ষার্থে আমি বললাম, “চা টা হোক। আমি একটু ছাদ থেকে আসছি!!” দিদি হেসে বলল, “হ্যাঁ যাও, তোমার নিয়ম পালন করো!! তবে তাড়াতাড়ি আসিস, চা একটু ঠাণ্ডা হয়ে গেলে তো আবার খাবি না।” কাবিদুল দা দিদির শাশুড়ি মা এর সাথে কথা বলছিল, দিদির কথা শুনে চেয়ারে বসে জিজ্ঞ্যাসু চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকায় দিদি আমার এখানে এলেই ছাদ থেকে নদি দেখার অভ্যাসের কথা বলল। কাবিদুল দা শুধু একটা, “ও আচ্ছা” সুচক হেসে ঘাড় নাড়ল।

আমি ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে ছাদে চলে গেলাম। পূর্ণিমা নয়। কিন্তু চাঁদটা বেশ বড়, প্রায় গোলাকার আর ফটফটে পরিস্কার আকাশ। আর দিদির শ্বশুরবাড়িটাও এ এলাকার সবচেয়ে উঁচু বাড়ি, তাই সূর্য ডুবলে চাঁদের আলো ছাড়া আর কোন বাড়ি বা রাস্তার আলো চোখে পড়ে না। ছাদটা পরিস্কার দেখা যাচ্ছে চাঁদের আলোয়। হেডফোন নেই। তাই এমনি মোবাইল স্পিকারেই, “কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া” প্লে করলাম। মৃদু আসন্ন গ্রীষ্মের মিঠে হাওয়া। গঙ্গার ওপাড়ের ইটভাটার প্রকাণ্ড চিমনি গুলোয় আলো জলছে। সেই আলো গঙ্গার জ্লে চিকচিক করছে। চাঁদের আলোয় ভালই বোঝা যাচ্ছে নদিটা।

“ভেবেছিনু কোথা তুমি স্বর্গের দেবতা, কেমনে তোমারে কব প্রনয়ের কথা”, গাইছেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। গরম যেহেতু পুরোপুরি পড়েনি, তাই হাওয়ার ঠাণ্ডা আমেজে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে বেশ। বাতাশে কিসের গন্ধ!? আমের মুকুল? নাকি পাশের বাড়িতে দেওয়া ধুনো!? কি মিষ্টি গন্ধটা। আমি আবেশে চোখ মুজলাম। 

-“তোমার চা”, চোখ খুলে পাশ ফিরে দেখি কাবিদুল দা।

-“ও, তু তুমি এলে। আমায় তো ডাকতে পারতে। আমাদের বেরতেও তো হবে”

-“তোমার দিদি, বড়দি অনেকবার ডেকেছেন। সাড়া পাননি। আর…”

-“আর!?”

-“তোমার প্রত্যেকবার এই ছাদে আসার কারণটা জানতে ইচ্ছে করলো। তাই বললাম, আমি চা টা নিয়ে যাচ্ছি। তোমার ছাদ প্রেমের কথা শুনে আমিও আমার চা নিয়ে চলে এলাম।”

চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে। গানের ভলিউমটা কমিয়ে দিয়ে, সামনে বিস্তৃত জলরাশির দিকে তাকিয়ে  বললাম, “সুন্দর না!?”

দেখলাম কাবিদুল দা তাকিয়ে আছে সামনে কিছুটা ভ্রু কুঁচকে। আমি সেটা দেখে হেসে বললাম, “এটা তোমার হাইওয়ে না, যে ওইভাবে দেখতে হবে। একটু কম মনোযোগ দিলে বরং আরও ভালো করে এসব দেখা যায়।” কাবিদুল দা আমার দিকে একবার তাকিয়ে ঠোঁটটা কামড়ে, আবার জলের দিকে তাকাল।

-“সিগারেট দেবে আমায় একটা!?”

-“তুমি তো খাওনা। তোমার তো গন্ধই সহ্য হয়না।”

-“আরে, একবার চেষ্টা তো করি! যদি লাগে ভালো! মদ খেলেও তো প্রথমে গলা জ্বালা করে শুনেছি। আর কিছু না হোক হাতে সিগারেট নিয়ে কেত মারা তো যাবে।”

-“কেত মারতে হবে না। নেশা ধরে গেলে আর ছাড়তে পারবে না। চাইলেও ছাড়া খুব মুশকিল।”

গান শেষ হোল। আমার চা’ও। বললাম, “নামা যাক এবার!? তোমার তো আবার তাড়া আছে বোধয়!”

বলে আমি পেছন ফিরতেই কাবিদুল দা বলল, “না তাড়া নেই!!”

অদ্ভুত শান্ত, গভীর, নিমগ্ন গলা। এমনিতেই কাবিদুল দা খুব একটা কথাত্তে না। শান্তই। তাই যাই বলে তাই বেশ গভীর মনে হয়, কিন্তু এ যেন একেবারে অন্য গভীরতা। 

আমি কি বলবো বুঝতে পারলাম না। শুধু তাকিয়ে রইলাম। কাবিদুল দা একিভাবে জলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “ব্যাথাটা কমেছে?” আমি বুঝতে না পেরে অস্ফুটে বললাম, “মমম!?” কাবিদুল দা চায়ের শেষ চুমুক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে একটু জোরে জিজ্ঞেস করলো, “হাতের ব্যাথাটা কমেছে!?” 

কাবিদুল দা’র বড় চুলগুলো হালকা হাওয়ায় উড়ছে। কিছু চুল মুখের সামনে এসে পড়ায় আমি চোখদুটো ভালো করে দেখতে না পেলেও বুঝতে পারছিলাম কি অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছে ছেলেটা আমার দিকে। কাবিদুল দা আদৌ মানুষ তো। আমি কাবিদুল দা’র চোখে চোখ রাখতে পারলাম না। আলো আঁধারি ছাদে আমি চোখ নামিয়ে বললাম, “হ্যাঁ…কমেছে। আরনিকা ভালো ওষুধ।”

-“আর যে ওষুধটা দিল, সে!?”

আমি কাবিদুল দা’র দিকে তাকালাম আবার। কিংকর্তব্যবিমূঢ়! কি, কি বলল ও!? না, মানে আমি কি ঠিক শুনলাম!? আমি এখন কোথায়!? আমি কে!? আমার গোটা গায়ে কাঁটা দিল। মাথাটা ভারী হয়ে এল যেন। এমন সময় নিচ থেকে দিদি ডেকে উঠল, “কিরে নাম এবার। তোদের ফিরতে রাত হয়ে যাবে তো এবার। সাড়ে আটটা বাজছে।”

কাবিদুল দা আমার সামনে থেকে সরে গিয়ে সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে গেল। আমার স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগলো, তারপর আমিও সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলাম।

আমি যাবার আগে দিদি, ওর যা কে রান্নাঘরে গিয়ে প্রনাম করে এসে, দালানে বসে থাকা মাসিমা মানে দিদির শাশুড়ি কে প্রনাম করতে, উনি অনুরোধ করতে লাগলেন যাতে রাত্রের খাবারটা অন্তত খেয়ে যাই। অনুরোধ রাখা সম্ভব না। কাবিদুল দা আছে, গাড়ি ভাড়া করার সময়ই বলা হয়েছিল যে গাড়ি জাস্ট গিয়ে ড্রপ করে ফিরে আসবে। দাঁড়াবে না। তবুও কাবিদুল দা সৌজন্য দেখিয়ে প্রায় ৪৫ মিনিট রইল, এই অনেক। আর কিছু বলা যায়না, উচিতও না। কিন্তু বয়স্ক মানুষরা এত যুক্তি বোঝেন না, বুঝতেও চান না। 

আমি প্রনাম সেরে যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি আবার আসবো আর সেদিন রাত্রে খাবো আর কয়েকদিন থাকব এই আশ্বাস দিলাম। কাবিদুল দা জুতো পড়ে বাইরে দাঁড়িয়ে। আমি একবার ফিরে তাকালাম। মাসিমা বরাবরের মতো আমাকেও ২০০ টাকা দিলেন। এটা উনার অভ্যাস। আমি ফিরে টাকাটা নিলাম। ফের কাবিদুল দা’র দিকে তাকালাম। কাবিদুল দা চোয়াল শক্ত করে ঘরে ঢুকে, জুতো পড়েই মাসিমা কে প্রনাম করলো।

মাসিমা, “না না, বাবা থাক থাক, ভালো থাকো, অনেক বড় হও। ঈশ্বর মঙ্গল করুক!” বলে আশীর্বাদ করতে লাগলেন। তারপর ২০০ টাকা বের করে কাবিদুল দা’কে দিতে গেলেন। কাবিদুল দা বাধা দিতে যাবে আমি ওর হাতের কব্জিটা চেপে ঘরে বললাম, “বলতে নেই। নিয়ে নাও!”

কাবিদুল দা আমার দিকে তাকিয়ে জাস্ট পাথর হয়ে গেল। 

-‘কি বাবা! নাও! মিষ্টি কিনে খেও!”

কাবিদুল দা আমার চোখ থেকে চোখ নামিয়ে আমার ওর ধরে থাকা হাতের দিকে তাকাল। আমিও সঙ্গে সঙ্গে ওর হাত থেকে সট করে হাতটা সরিয়ে ভীষণ লজ্জা পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠলাম। 

মিনিটখানেক পরে, কাবিদুল দা গাড়ির ডানদিকে উঠল। “পৌনে নটা বেজে গেল” বলে উঠল কাবিদুল দা। গাড়ি ছেড়ে দিল। 

(ক্রমশ….)

(অনুগ্রহ করে ব্লগের নিচের কমেন্ট বক্সে জানান, কেমন লাগছে পড়ে। এতে উৎসাহ পাওয়া যায়।)

Author:

Leave a Reply

Your email address will not be published.