কাবিদুল দা (পর্ব ১১)

 (দশম পর্বের পর…)

খাওয়ার টেবিলে যখন বসলাম, বাবার তখন অর্ধেক খাওয়া হয়ে এসেছে। মা আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমায় দেখে নিজের প্লেটে সঙ্গে আমার প্লেটে খাবার বেড়ে দিল। বাবা একমনে খেয়ে যাচ্ছে, আর বাম হাতে নিজের ফোন এর স্ক্রিন স্ক্রল করছে। আমি, মা চুপচাপ খেতে শুরু করলাম। কিছুক্ষন পর, না থাকতে পেরে বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কার্ত্তিক দা… কি বলেছে!?”

বাবা কিছুক্ষন একইভাবে নিজের ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল, “কার্ত্তিক এ ব্যাপারে কিছু জানে না বলল। ও ব্যাবস্থা নেবে।”

বাবা থেমে গেল। বাবা এটুকু কথায় থেমে যাওয়ার লোক নয়। কার্ত্তিক দা নিশ্চয়ই বাবাকে আরও কিছু বলে ঠাণ্ডা করেছে। আমার গলা শুকিয়ে এল। একবার এও মনে হল কাবিদুল দা কার্ত্তিক দা’কে চুরির ব্যাপারটা বলেনি কেন!? অবশ্য ঘটনাটা আগের দিনের। রাত্তিরে ফিরেছে তার ওপর আজ তো সারাদিন আমার সাথেই….

হঠাত খেয়াল পড়ল ১১ঃ১৫ বাজে।! এহ! ওকে বললাম ১০ মিনিটে আসছি। ১৫ মিনিট হয়ে গেল। গোগ্রাসে রুটি দুটো খেয়ে মা কে বললাম, “আজ দুধ আর খাবো না, শরীরটা ভাল নেই, শুচ্ছি!” মা কোন সাড়া দিল না। মা নিশ্চিত জানে আমি ঢপ মারছি। মা’কে মিথ্যে বলা যায়না, জাস্ট যায়না।

নিজের ঘরে ঢুকে দরজা ভেতর থেকে লক করে, বিছানায় লাফিয়ে উঠে ফোন হাতে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে হোয়াটসাপ খুলে লিখলাম, “খাওয়া হয়ে গেছে!”

৫ মিনিট … ১০… ১৫… কোন উত্তর নেই। ছেলেটা অনলাইন। আরও ১৫ মিনিট কেটে গেল। হঠাত, “পিং!”

-“👍”

-” তুমি… আমমম, ঠিক আছো? মানে.. কি ঘুম পাচ্ছে তোমার!?”

-“হম!”

-“তাহলে…শুয়ে পড়! রাত করা ঠিক…”

টাইপ করছি, কাবিদুল দা’র মেসেজ এল, “কিছু মনে কর না। আজ শুয়ে পড়ছি। কাল সকালেই আমার একটা জরুরী দরকারে বেরোতে হবে। তুমিও শুয়ে পড়।”

আমার বেশ খটকা লাগল কথাটা শুনে। নিজের লেখাটা ডিলিট করলাম। এটা ঠিক কাবিদুল দা স্বরূপ কথা তো নয়। বা হয়ত আমিই বেশি ভাবছি। নাহ! সত্যিই হয়ত…

লিখলাম, “না না.. মনে কেন করব! তুমি শোও। কাল কথা হবে।”

-“গুডনাইট”

-“গুড নাইট”

শুয়ে পড়লাম। বাবা বেশি কথা বলেনি রাত্রে খাবার সময়। কাবিদুল দা’ও কেমন একটা করল আমার সাথে। হচ্ছেটা কি!? উফ! এভাবে আমি ঘুমোই কিকরে!? একবার কাবিদুল দা’কে পিং করব!? ও এমন বেমক্কা একটা স্মাইলি অবধি পাঠাল না কেন শেষে! ওর একটাও ছবি নেই আমার কাছে, যে একটু চেয়ে… না ডিপিটা হোয়াটসাপের… কিন্তু ও তো ওর বাইসেপের দিকে তাকিয়ে আছে, ধ্যাত্তেরি! ওর মুখটা একটু যদি! আমার কান্না পাচ্ছে। পাশবালিশ আঁকড়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম একরকম অকারনেই! যে লতা একটা মোটা গাছের গুঁড়ি পেয়ে, ঠিক তাকে বেয়ে ওঠার সময়েই কাষ্ঠল গাছটাকে সমুলে উপড়ে ফেলার চক্রান্তের গন্ধ পায়, তার দুঃখ পেতে গাছ কাটা অবধি অপেক্ষা করতে হয়না। সে কাঁদতে থাকে। আমিও কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়েও পড়লাম কোন সময়। 

সকাল সাতটা, ঘুমটা ভাংল। তড়াক করে উঠে ফোনটা চেক করলাম। উফফ! কি অশান্তি! না না ও বোধহয় এখন ঘুমোচ্ছে! হঠাত, আমার ঘরের দরজায় নক। মায়ের গলা, “বাবাই উঠে পড়েছিস!? একটু দরকার আছে!” আমি উঠে দরজা খুলতেই দেখি মায়ের হাতে ফোন। কেউ একটা ফোনে আছে। মা বলল, “কার্ত্তিক তোর সাথে কথা বলবে।”

আমি ফোনটা কানে নিয়ে হ্যালো বলতে ওপার থেকে কার্ত্তিক দা বলল, “বাবু, ঘুমোচ্ছিলে বোধয়!”

-“না, না উঠে পড়েছি। কি বলছিলে বল।”

-“না মানে, তোমার বাবাকেই করতাম, কিন্তু তোমার বাবাকে তো তুমি চেনোই! বড়বাবুকে কিছু বোঝানো যায়না। উনি তোমার হার চুরির জন্য আমাকে দায়ি করছেন। আমি নাকি কাবিদুল কে লাগিয়ে কাজটা করেছি। আমি এতদিন তোমাদের কত জায়গায় গাড়িতে নিয়ে গেছি এসেছি, কোনোদিন কিছু হয়েছে?। আর এই একদিন কাবিদুল টা গেল, আর তাতেই!!। ছেলেটাকে ভাল বলেই তো জানতুম বাবু কিন্তু এই কোভিড হয়ে কাজে মন্দা লেগেছে, ঘরে ঘরে অভাব এখন, কিছু করলে ও করেও থাকতে পারে। আমি তাই কাবিদুল’কে আজ সকালেই ডেকে, আচ্ছা করে ঝেড়ে, গ্যারেজের মালিককে বলে, ওকে বের করে দিয়েছি এখান থেকে। এমনিতে রগচটা ছেলে কিন্তু ও আজ আমার একটা কথার পতিবাদও করলনা বাবু। কে জানে, বিবেকের দংশন কিনা! যে সৎ, সে কি এভাবে চুপ থাকতো!? ওই মনে হয় কিছু করেছে! কিন্তু তুমি একটু তোমার বাবাকে বোঝাও বাবু। আমি গরিব লোক… বলে গলা ভেঙ্গে এল কার্ত্তিক দা’র!”

আমার মাথা কাজ করছেনা তখন। আমি হুম হাম আচ্ছা কিছুই না বলে ফোনটা কোনরকমে মা এর হাতে দিয়ে ঘরের দরজা দিয়ে বিছানায় এসে বসে পড়লাম। 

এ কি সর্বনাশ করে ফেললাম আমি! হ্যাঁ! আমিই তো করলাম। আমি কেন ওই ভিখারিকে, মানে চোরকে… আআহ!!! নিজের ফোনটা হাতে নিলাম। ছেলেটা আজ সকাল থেকেই অনলাইন হয়নি! ওর সাথে কি কাল রাত্রেই কার্ত্তিক’দার একচোট হয়েছিল!? সেইজন্যই ওইভাবে রিয়াক্ট করছিল!? আর সত্যিই এই কোভিডের সময়ে, ও এখন কোথায় কাজ পাবে!? ওর সব রাগ নিশ্চয়ই, আমার ওপর এসে পড়েছে!?

এমন সময় আমার ফোনে পিং!  কাবিদুল দা’র মেসেজ। 

-“সুপ্রভাত!”

-” তুমি!…”

-“আমি!?”

-“তুমি!!!!”

-“আমি, কি!?”

-“তুমি আজ আমার সাথে দেখা কর একবার প্লিজ!”

-“হম, আমারও আজ তোমার সাথে দেখা করার ব্যাপারেই এত সকালে মেসেজ পাঠানো!”

-“কোথায় মিট করবে!?” 

-“কালুদা’র চায়ের দোকানে এস, সেখান থেকে একসাথে যাব।”

-“কোথায় যাব!?”

-“কেন!? ভরসা হচ্ছে না!? তোমাকে তোমার বাবা’র থেকে চুরি করে নেব না, চিন্তা নেই। আজ তাহলে বিকেল বেলা এস, ওই ৫ টা! চাপ আছে!?”

কথাটা সহ্য করলাম। কিন্তু সব অনুভুতি ছাপিয়ে যে কথাটা আমার মনের ঘরে ছড়িয়ে গেল, তা হল, কাবিদুল দা ভালো নেই। ও ভাল না থাকলে মাসিমা’ও ভালো থাকবেন কিকরে!”

বললাম, “না, অসুবিধে নেই। যাব!”

রিপ্লাই করল, “✌”

সারাদিন হানটান করে পৌঁছে গেলাম কালুদার দোকানে ৫ টার আগেই। পড়েছি নিল রঙের টিশার্ট ফুল স্লিভ আর ডিপ কালো একটা জিন্স। কাবিদুল দা আসেনি এখনও। ৪ঃ৫০ বাজে। ও এল ঠিক ৫ টায়। পরনে একটা বটল গ্রিন কুর্তা, বেশ টাইট। নিচে পড়েছে লাইট ব্লু জিন্স। মস্তান মস্তান দেখতে লাগছে।

(ক্রমশ…)

(অনুগ্রহ করে ব্লগের নিচের কমেন্ট বক্সে জানান, কেমন লাগছে পড়ে। এতে উৎসাহ পাওয়া যায়।)

Author:

Leave a Reply

Your email address will not be published.